বিদ্রুপে বিদ্রোহের আগুন

নারী সমাজ: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

নারী সমাজ: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের ‘ নারী ‘ কবিতার কটি লাইন দিয়ে শুরু করতে চাই এভাবে-

যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না’ক, নারীরা আছিল দাসী!

আর এরই সাথে আমি বলতে চাচ্ছি-
আর নয় অলংকরী
দিতে হবে সরাসরি
জানি সুনিশ্চয়
হবে হবে জয়
সেদিন আর বেশি দূরে নয়।

সমাজ সভ্যতার আদিকাল থেকেই নারী তার অধিকার থেকে বঞ্চিত। বঞ্চিত তার পরিবার থেকে বঞ্চিত সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে আর সে ক্ষেত্রে পুরুষেরাই পরিবারের একচ্ছত্র আধিপত্য, সরকার, রাষ্ট্র,তথা বিশ্ব ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নারীর অগ্রগতির দিকে ধাবিত হচ্ছে ততই কোন এক পেশিশক্তির ধ্রুমজাল সৃষ্টির কারণে অর্জনের পর ফলপ্রসূ অবস্থান ধরে রাখতে পারছে না। ক্রমেই পেশিশক্তি সুকৌশলে নারীদের সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার দিকে টেনে নিচ্ছে।এক্ষেত্রে সব চেয়ে বড় সুযোগ নিচ্ছে সামন্তবাদী দল গুলো।তারা নারীকে অলংকৃত করে শোভা বর্ধন করে রাখছে। আর এ হলো নারী সমাজের অগ্রগতি।

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক আন্তর্জাতিক দিবস এর মধ্য দিয়ে নারীবাদী আন্দোলন প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে আর সে থেকে প্রতিবছর ৮ ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে কিন্তু আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল লক্ষ্য আজওঅর্জিত হয়েছে? যেখানে নারীরা তাদের ন্যায্য মজুরি ও সম্মানটুকু পাচ্ছে না বরং বঞ্চনা অবহেলা, অপুষ্টি অনাহার-অর্ধাহারে নিত্যদিনের সঙ্গী যেখানে নারী অধিকার কে সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?

‘ নেতৃত্ব আসুন নারী’ – জাতিসংঘের এ আহবানে সাড়া দিয়ে বলতে হয় অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ সংস্কারের সামলিয়ে নারী এক টলায়মান অবস্থানে দাঁড়িয়ে নিজেদের অবস্থানের শক্ত করার চেষ্টা করছে। প্রতিরোধ গড়ে তুলছে বারবার।

তারপরও অধিকার প্রতিষ্ঠা কোন সক্ষম হয়নি। এর মূল কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশ্বাসের কথা বলে যে ভাবে বিশ্বব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে তা কখনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সুখবার্তা নয়। মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা, মুক্তরাজনীতি উদারনীতি সবকিছুকে বাধাগ্রস্ত করছে।
হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায় বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম একটি নারী নির্যাতন ঘটনা বহুল দেশ।

দিন দিন এ দুর্বিষহ অবস্থার পরির্তন ঘটেছে,নির্যাতনের সংখ্যা ও ভয়াবহতা পূর্বের তুলনায় কমে আসছে কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে প্রায় তিন- দশক ধরে দেশের প্রধান ২ টি রাজনৈতিক দলের সর্বোচ্চ পদে আসীন দু- জন নারী,কিন্তু তারা কি সত্যিকারের অর্থে নারী ভাগ্যে র দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছেন,যার মধ্য দিয়ে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সত্যি সম্ভব? যদিও বিশ্ব সভ্যতার অন্যতম নির্মাতা নারীরা।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১০ নং অনুচ্ছেদ জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিধান থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চরম ব্যর্থতা থেকে গেছে। সারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে যেসব দেশের সংসদে নারী প্রতিনিধি হার বেশি সেসব দেশের দুর্নীতি অপেক্ষাকৃত কম। আমাদের দেশে নারী আসন এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো নির্বাচনের সুযোগ না থাকায় নারীদের জাতীয় সংসদের ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে নারী সমাজে চাহিদার কোনো প্রতিফলন ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা থাকছে না।

অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুরুষের হাতে থাকার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারীদের মূল পর্ব থেকে বাইরে রেখেছেন। এই বাস্তবতায় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে আসছে এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার কালোটাকার দৌরাত্ম্য সনাতনী চিন্তা,ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষ্য,আত্নীয়করন, দুর্নীতির ইত্যাদি কারনে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ সম্প্রতি প্রকাশিত “World Economic Forum” এর সমীক্ষায় বলা হয়।

রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে র ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নারীদের অবস্থান ভালো নয়।আর এ কারণে বিশ্বের নারীর সামগ্রিক অবস্থা খারাপ রয়ে গেছে বর্তমান সময়ের সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এটা যেমন সত্য তেমনি ইউনিয়ন পরিষদ পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নারীদের দায়িত্ব থেকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে।বৈষম্য রয়ে গেছে মানসিকতা সংস্কৃতির মধ্যে।এখনও ধর্মীয় দিক থেকে বিষয়টি পুরোপুরিভাবে অবমূল্যায়ন করে নারী অধিকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়, যা ধর্মীয় দৃষ্টিতে কখনো ই কাম্য নয়।ধর্মে নারীর অবস্থান অনেক ঊর্ধ্বে।

কোন ধর্মে নারীদের সবচেয়ে উঁচু আসনের অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। আমরা যথাযথ ধর্মীয় পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি, বরং কুসংস্কারে আরো নিমজ্জিত হচ্ছি।সময়ের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে নারীরা সমাজে শিল্প-বাণিজ্য রাজনীতি এবং প্রতিযোগিতামূলক অনেক কাজে দক্ষতা দেখাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে কথা না বললেই নয় যে,সেসব কাজ মূল্যায়িত হচ্ছে না। দুর্নীতি আজ রন্ধে রন্ধে প্রবেশ করছে আর অসাম্য পরিবেশ কাটিয়ে উঠতে চাই নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ।

নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি জাতি আলোর মুখ দেখতে পারে তাই তো সময়ের প্রয়োজনে নারীর প্রতি সকল বৈষম্য প্রতিরোধ করা প্রয়োজন।কাল মার্কসের সাথে একাত্ন হয়ে বলা যায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি নারী উন্নয়নের আন্তরিক না হয়।

তাহলে নারী অগ্রগতি সম্ভব নয় নারীর সামগ্রিক উন্নয়নের কথা ভেবে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় পুরুষ ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে আর তা না হলে দেশ তথা জাতীয় উন্নয়নে বাধা গ্রস্থ কেননা অর্ধেক জনশক্তির অন্ধকারে রেখে জাতি কখনোই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনা।তাইতো নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য প্রতিরোধে পুরুষের বেশি বেশি সম্পৃক্ততায় মুহূর্তে প্রয়োজন যেমন যৌতুক, বাল্যবিবাহ, এসিড নিক্ষেপ,ফতোয়া, পারিবারিক নির্যাতন, ধর্ষণ, স্বামী-স্ত্রীর বয়সের পার্থক্য, মজুরি বৈষম্য – এসব বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

আর তাহলেইসৃষ্টি হবে সুখী সমৃদ্ধ একটি দেশ, যেখানে থাকবেনা ক্ষুদা – দারিদ্র, অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও নারী পুরুষের বৈষম্য।যোগ্যতার যোগ্যতাক্র মাপকাঠি ধরে নারী ও পুরুষ নয় মানুষ হিসেবে এগিয়ে যেতে হবে ভবিষ্যতের দিকে তাহলে প্রজন্ম সুষ্ঠু সুন্দর আলোকিত মানুষ হিসেবে ছড়িয়ে পড়বে গোটা পৃথিবীতে সৃষ্টি হবে শোষন মুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও পেশি শক্তি মুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা।


আরো পড়ুন: গ্যাস্ট্রিক থেকে মুক্তির উপায়
আরো পড়ুন: দিও না গো গাল – মোঃ ইমন খন্দকার হৃদয়
আরো পড়ুন: মধ্যবিত্ত – নুর আতিকুন নেছা
আরো পড়ুন: পানি সংকটেই জীবন বিপন্ন – সায়লা শবনম রিচি


এক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটলের উক্তিটি স্মরণযোগ্য- ” মানুষের প্রয়োজনে যেমন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে,তেমনি উন্নততর জীবন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র সদা সংক্রিয় থাকবে।

উন্নততর জীবন প্রতিষ্ঠা নারী ও পুরুষ বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থায় পারে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে আমাদের দেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। আমাদের সেই লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে সেখানে আগামী প্রজন্ম একটি শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াতে পারে।

টুনু রাণী কর্মকার
সহকারী অধ্যাপক – রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ
অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়।

যুক্ত হোন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এখানে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *