লাইফ ফোকাস পর্ব-১

লাইফ ফোকাস পর্ব-১ উচ্চমাধ্যমিকে কিংবা কলেজ জীবনে কেমন পড়াশোনা করেছিলাম তা নিয়ে বেশকিছু প্রশ্ন পেয়েছি। তবে প্রশ্নগুলোর উত্তর এক এক করে দেয়ার থেকেও একসাথে একটি পোস্ট করে লেখাটা উত্তম বলে মনে হয়েছে। যাই হোক, আমাদের সময় এসএসসির ফলাফল দিতে প্রায় ৩ মাসের উপরে সময় নিয়েছিল।

ওই সময়টাতে আসলে প্রথম দুই সপ্তাহ ঘুমিয়ে, ঘুরে ফিরে কেটেছিল। কিন্তু দুই সপ্তাহ পেরুনোর পর, একদিন আব্বা ডেকে নিয়ে বললেন, আমি তোমাকে কলেজের পর ঢাকাতে পড়াশোনা করতে দিবো, তার আগে নয়। আমাদের সরকারি কলেজেই তোমাকে ভর্তি হতে হবে এখন এবং এখানে থেকেই ভালো ফলাফল করে ঢাকায় যেতে হবে।

সাথে আরো বললেন যে এই সময়টা অলস বসে না থেকে কাজে লাগাও কলেজের পড়াশোনা এখন থেকেই শুরু করে দাও। তাহলেই ভালো ফলাফল করতে পারবে। যাই হোক, একটু খারাপ লাগলেও বাবার কথা অনুযায়ী এইচএসসির প্রথম বর্ষের বইপুস্তক কিনে পড়াশোনা শুরু করি। কিছু কিছু বিষয় যেমন অর্থনীতি আমার জন্য নতুন বিষয় ছিল তাই আগেই ঐটার প্রাইভেট পড়া শুরু করি পাশাপাশি। মোটামুটি ২.৫ মাসেই প্রথম বর্ষের সিলেবাস শেষ করলাম। প্রতিদিনই পড়াশোনা করতাম একদম রুটিন মাফিক।

যথারীতি এসএসসিরও ফলাফল দিলো। কাঙ্খিত ফলাফল জিপিএ ৫.০ পেলাম ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে। তারপর ভর্তি হলাম আমাদের সরকারি কলেজে। আগে থেকেই প্রথম বর্ষের সিলেবাস আমার শেষ কিন্তু তারপরও নিয়মিত ক্লাস করতাম এবং পুরো কলেজ জীবনে আমার উপস্থিতি ছিল ১০০%। ক্লাসে স্যার-ম্যাডামদের লেকচারও শুনতাম ভালো করে, ক্লাসে রেসপন্সও ভালো ছিল।
কলেজের প্রথম দিন একটা প্রশ্ন করেছিলেন হিসাববিজ্ঞানের এক শিক্ষক যার উত্তর কেউ দিতে পারেনি কিন্তু আমি দিয়েছিলাম এবং মজার ব্যাপার হলো স্যার আজও আমাকে মনে রেখেছেন। কলেজের ক্লাস শুরু হবার পর হিসাববিজ্ঞান এবং ইংরেজির প্রাইভেট পড়া শুরু করলাম।

মজার ব্যাপার হচ্ছে ইংরেজির প্রাইভেট আমি প্রথম বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে পড়া শুরু করলেও হিসাববিজ্ঞানের প্রাইভেট পড়া শুরু করেছিলাম দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে। অবশ্য প্রথম দিন হিসাববিজ্ঞানের প্রাইভেটে স্যার বেশ কিছু সমস্যা সমাধান করতে দিয়েছিলেন আমার লেভেল বোঝার জন্য। স্যারের ঐসবগুলো প্রশ্নের সমাধান আমি নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করেছিলাম বলে স্যার দ্বিতীয় বর্ষের সাথে দিয়ে দিলেন আমাকে।

আর এই নিয়ে দ্বিতীয় বর্ষের আপুদের থেকে অনেক রকম কথা শুনতে হতো। আমি হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্রের ফাইনাল একাউন্টস সমাধান করতাম এক ঘন্টায় ছয়টি এবং দ্বিতীয় পত্রের ফাইনাল একাউন্টস সমাধান করতাম এক ঘন্টায় চারটি করে। এছাড়াও বাকি সমস্যাগুলোও দ্রুত সমাধান করতাম আমি। তবে দিনগুলো ভালোই ছিল কারণ দ্বিতীয় বর্ষের সিলেবাসও আমি কলেজের প্রথম বর্ষের প্রথম ৫ মাসে শেষ করতে পেরেছিলাম।

কেবল হিসাববিজ্ঞানই নয় ইংরেজি, অর্থনীতি, বাংলা সব স্যারদের কাছেই আমার সেই রকম সুনাম ছিল আজও আছে। অর্থনীতি স্যারের প্রাইভেটে প্রথম এক দুই সপ্তাহ পরেই স্যার আমাকে অনার্সের প্রথম বর্ষের সাথে দিয়ে দেন আমার লেভেলের কথা চিন্তা করে। বাংলার স্যারও আমাকে প্রায় ৮ মাস পড়ানোর পরও কোনো পারিশ্রমিক নেন নি। স্যার বলতেন তোমাকে পড়িয়ে আমিও অনেক কিছু জানতে পেরেছি।

হিসাববিজ্ঞানের স্যার কিছু দিন আগে অবসরে গিয়েছেন এবং স্যার আজও বলেন তোমার মতো কাউকে আমি আর পাইনি। বাজারে হিসাববিজ্ঞানের যত বই ছিল সবগুলো বই আমি শেষ করেছি স্যারের প্রাইভেটে। পরে এমনও হয়েছিল কলেজের লাইব্রেরি থেকে আগেরও কিছু বই এনে করেছি। আমাদের শহরে একটি পাবলিক লাইব্রেরি ছিল যা আজও আছে। ওই লাইব্রেরিতেও আজও হিসাববিজ্ঞানের এমন কোনো বই নেই যা আমার করা হয় নি।

কলেজ জীবনে আমি বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা এবং মানবিক নিয়ে প্রথম ছিলাম এবং কলেজের যাবতীয় পরীক্ষাগুলোতেও প্রথম ছিলাম।
তবে সবকিছুর মুলে ছিল কঠোর পরিশ্রম। প্রতিদিন ভোর ৫ টায় ঘুম থেকে উঠে নামাজ পরে তারপর ৬ টার দিকে ইংরেজির প্রাইভেটে যেতাম। ৭.৫০ এর দিকে প্রাইভেট শেষ করে এসে হালকা নাস্তা করে আবার কলেজে যেতাম ক্লাস করার জন্য।
আমার কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের ক্লাসের ক্যাম্পাসটি একটু দূরে ছিল প্রধান সড়ক থেকে। যাবার জন্য কেবল রিকশা পাওয়া যেত ওই সময়ে।


আরো পড়ুন: বিশ্বের ৯টি ঐতিহাসিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম
আরো পড়ুন: রামাদান – মুহা.আল মামুন ইবনে শহিদ
আরো পড়ুন: paragraph: Plysical Exercise(বাংলা অর্থসহ)
আরো পড়ুন: paragraph: A Street Hawker (বাংলা অর্থসহ)


আবার সকাল বেলায় রিকশা পাওয়াটাও অনেক কষ্টের ছিল। তাই এই পুরো এক থেকে দুই কিলোমিটার রাস্তা হেটে কলেজে যেতাম আবার ফিরতামও হেটে। তারপর টেম্পুতে করে বাসায়। বাসায় ফিরেও রেস্ট নেয়ার সময় ছিল না। দুপুরের খাবার খেয়েই আবার হিসাববিজ্ঞানের প্রাইভেটে যেতাম। হিসাববিজ্ঞানের প্রাইভেট শেষ করে বাসায় এসে একটু রেস্ট নিয়ে আবার সন্ধ্যায় শুরু হতো পড়াশোনা যা রাত একটা পর্যন্ত চলতো।

বন্ধের দিনগুলোতেও একই রুটিন মেনে রাখার চেষ্টা করতাম। আমি পড়ার থেকেও লিখতে পছন্দ করতাম বেশি। এজন্য প্রতি ১০ দিনে আবার এক রিম কাগজ যেত। এত কিছু করার মুলে স্বপ্ন সবসময় একটাই ছিল বাইরে পড়াশোনা করা, পিএইচডি ডিগ্রী নেয়া এবং সর্বোপরি ভালো কিছু করা। আমার অনেক শিক্ষক তাই আমাকে দেখে বলতেন “morning shows the day”। তোমাকে দেখলেই এই কথাটি মনে পরে।

কলেজ জীবনের ইতি ঘটেছে সেই ২০০৭ সালে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে আবারো জিপিএ ৫ লাভের মাধ্যমে তাও পুরো জেলার মধ্যে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় একমাত্র জিপিএ ৫ হিসেবে। আমাদের সময়ে এসএসসি এবং এইচএসসি কোনো পরীক্ষাতেই জিপিএ ৫ এত সহজ ছিল না। বরং অনেক চেষ্টা করেই কেবল ভালো ফলাফল করা যেত। ।

আজও আমার স্যার-ম্যাডামরা আমাকে মনে রেখেছেন। আমিও চেষ্টা করি তাদের সাথে যোগাযোগ রাখার কারণ তাদের পরিশ্রম এবং জ্ঞান বিতরণের কারণেই আজ আমি এত দূর আসতে পেরেছি। সর্বোপরি, আমার মাতা-পিতার দুআ নিয়েই এতদূর চলা।

মা-বাবার সেবা-যত্ন করুন। ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন। আর অন্যায়কে সর্বদা না বলুন। একে অন্যের সাহায্য করুন।
নূর-আল-আহাদ
<Financial Engineer > Eccentric Economist > Futurist>
বিবিএ (ইউনিভার্সিটি অফ ঢাকা) ১৪ তম ব্যাচ
এমবিএ (ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়া)
মাস্টার অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (ফিনান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, জাপান)
ফিনান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক (জাপান)
(Acquiring knowledge does not have a full-stop, rather it always has comma – Ahad)

 

যুক্ত হোন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এখানে ক্লিক করুণ।

Leave a Comment