হুমায়ুন আজাদ এর জীবনী

হুমায়ুন আজাদ এর জীবনী:


হুমায়ুন আজাদ (২৮ এপ্রিল ১৯৪৭ বঙ্গাব্দ ১২ আগস্ট ২০০৪ খ্রিস্টাব্দ; ১৪ বৈশাখ ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ ২৬ শ্রাবণ ১৪১১ বঙ্গাব্দ) একজন বাংলাদেশি কবি, রাজনীতিক ভাষ্যকার, কিশোর-সাহিত্যিক, গবেষক, ঔপন্যাসিক, ভাষা বিজ্ঞানী, সমালোচক, রাজনীতিক ভাষ্যকার, কিশোর সাহিত্যিক, গবেষক, এবং অধ্যাপক ছিলো। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রথা-বিরোধী ও বহুমাত্রিক লেখক যিনি ধর্ম, মৌলবাদ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্কার বিরোধিতা, যৌনতা, নারীবাদ ও রাজনীতি বিষয়ে তার বক্তব্যের জন্য ১৯৮০ এর দশক থেকে পাঠক-গোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়ে ছিলো। হুমায়ুন আজাদের ৭টি কাব্য-গ্রন্থ, ১২টি উপন্যাস ও ২২টি সমালোচনা গ্রন্থ, ৭টি ভাষা-বিজ্ঞানবিষয়ক, ৮টি কিশোর-সাহিত্য ও অন্যান্য প্রবন্ধ-সংকলন মিলিয়ে ৬০টিরও অধিক গ্রন্থ তার জীবদ্দশায় এবং মৃত্যু পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয়। ১৯৯২ সালে তার নারী-বাদী গবেষণা সংকলন-মূলক গ্রন্থ নারী প্রকাশের পর বিতর্কের সৃষ্টি করে এবং ১৯৯৫ – ২০০০ সাল পর্যন্ত সাড়ে ৪ বছর ধরে বইটি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ছিলো। এটি তার বহুল আলোচিত গবেষণা মূলক কাজ হিসাবেও স্বীকৃত ছিলো। এছাড়াও তার পাক সার জমিন সাদ বাদ উপন্যাসটি পাঠক মহলে বিতর্কের সৃষ্টি করে ছিলো। তার রচিত প্রবচন সংকলন ১৯৯২ সালে হুমায়ুন আজাদের প্রবচ-নগুচ্ছ নামে প্রকাশিত হয়। তাকে ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১২ সালে সামগ্রিক সাহিত্য-কর্ম এবং ভাষা-বিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয় থাকে। ২০০৩ সালে তার রচিত কিশোর সাহিত্য ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না (১৯৮৫) এবং আব্বুকে মনে পড়ে(১৯৯২) জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়ে ছিলো।

হুমায়ুন আজাদ প্রথা-গত ধ্যান-ধারা সচেতন-ভাবে পরিহার করতেন। তার সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য, প্রগতিবাদিতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা, পল্লী-প্রেম, নর-নারীরপ্রেম, সামরিক শাসন ও একনায়ক-তন্ত্রের বিরোধিতা এবং নারী-বাদের জন্য পরিচিত। তার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত অভীষ্ট তার সাহিত্যকে প্রভাবান্বিত করে ছিলা। কথা-সাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করে ছিলো। পাক সার জমিন সাদ বাদ উপন্যাসে মৌলবাদীদের সমালোচনা করার কারণে ২০০৪ সালে তিনি হামলার শিকার হয়েছেন।

হুমায়ুন আজাদ
হুমায়ুন আজাদের আলোকচিত্র
অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ

জন্ম: হুমায়ুন কবীর, ২৮ এপ্রিল ১৯৪৭, কামারগাঁ, শ্রীনগর, বিক্রমপুর (বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ), ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে বাংলাদেশ),
মৃত্যু:১২ আগস্ট ২০০৪ (বয়স ৫৭) মিউনিখ, জার্মানি,
সমাধিস্থল: রাঢ়িখাল,
পেশা: কবি
ঔপন্যাসিক: গল্পকার সমালোচক ভাষা বিজ্ঞানী অধ্যাপক গবেষক।
জাতীয়তা: ব্রিটিশ ভারত (এপ্রিল – আগস্ট ১৯৪৭),
পাকিস্তান (১৯৪৭ থেকে ১৯৭১), বাংলাদেশ (১৯৭১ থেকে ২০০৪),
শিক্ষা: স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর (বাংলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), পিএইচডি (ভাষাবিজ্ঞান, এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়),।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়।
ধরনসমূহ: আধুনিক।
সাহিত্য আন্দোলন: প্রথা বিরোধিতা।
উল্লেখযোগ্য রচনা: অলৌকিক ইস্টিমার।
সব কিছু ভেঙে পড়ে নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু একটি খুনের স্বপ্ন।

উল্লেখযোগ্য পুরস্কার: একুশে পদক ২০১২ মরণোত্তর, বাংলা একাডেমি পুরস্কার ১৯৮৬।
সক্রিয় বছর: ১৯৭৩, ১৯৮০ থেকে ২০০৪,
দাম্পত্যসঙ্গী: লতিফা কোহিনূর ( বি. ১৯৭৫; মৃত্যুপূর্ব ২০০৪)।

সন্তান: মৌলি-আজাদ, স্মিতা-আজাদ, অনন্য-আজাদ।

আত্মীয়:

আবদুর রাশেদ ( পিতা )
জোবেদা খাতুন ( মাতা )

জীবন:


প্রাথমিক জীবন:
হুমায়ুন আজাদ ২৮এপ্রিল ১৯৪৭ সালে তার মাতা-মহের বাড়ি, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমানে বাংলাদেশ) অধীন বিক্রম-পুরের কামারগাঁয় জন্ম নেন; যেটি বর্তমানে মুন্সি-গঞ্জ জেলার শ্রী-নগর উপজেলার অন্তর্গত। তার জন্ম নাম ছিলো হুমায়ুন কবীর। ১৯৮৮ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর নাম পরিবর্তনের মাধ্য তিনি বর্তমান নাম ধারণ করেন। তার বাবা আবদুর রাশেদ ১ম জীবনে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও পোস্ট-মাস্টার পদে চাকরি করতেন, পরে ব্যবসা পেশা বেচে নেন। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। মা জোবেদা খাতুন ছিলো এক গৃহিণী, যিনি ২০০৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ৩ভাই এবং ২বোনের মধ্যে আজাদ ছিলো পিতা-মাতার ২য় পুত্র-সন্তান। ছেলে বেলায় তার ১৫বছর বয়স পর্যন্ত তিনি রাড়ি খাল গ্রামে বেড়ে ওঠেন। পরবর্তীতে তার বিভিন্ন লেখায় বিভিন্ন ভাবে রাড়িখাল গ্রামের বর্ণনা উঠে এসেছে এবং এ গ্রাম নিয়ে তিনি ” রাড়িখাল : ঘুমের ভেতরে নিবিত শ্রাবণ-ধারা ” নামে একটি লেখা প্রকাশ করেন। আজাদের মতে তার শৈশব ও কৈশোর ছিলো তার জীবনের শ্রেষ্ঠ খণ্ড, যে সময়ের কথা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে তার ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না (১৯৮৫), নিজের সাথে নিজের জীবনের মধু (২০০০), শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্তজবা (২০০২) এবং বিভিন্ন লেখায় উঠে এসেছে। আজাদের গ্রামের মাইল দুয়েক দক্ষিণে রয়েছে পদ্মা নদী, রাতের বেলায় নদীতে স্টিমার চলার ধ্বনি শৈশবে তাকে প্রভাবিত করায় তিনি তার ১ম কাব্য গ্রন্থের নাম দেন অলৌকিক ইস্টিমার (১৯৭৩)।

১৯৫২ সালে আজাদ দক্ষিণ রাড়িখাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইনফ্যান্ট (প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা) শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছেন, সেখানে তিনি ইনফ্যান্ট থেকে ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত মোট ৪ বছর অধ্যয়ন করেন।৪র্থ শ্রেণীতে পড়ার জন্য তিনি স্যার জে সি বোস ইন্সটিটিউটে ভর্তি হন। ছেলে বেলা থেকেই তিনি ছিলো মেধাবী। এ বিদ্যালয় থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন (মাধ্যমিক) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

উচ্চশিক্ষা:


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে হুমায়ুন আজাদ (মাঝে)
১৯৬২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য আজাদ ঢাকায় চলে আসেন। মানবিক বিভাগে পড়ার ইচ্ছা থাকলেও বাবার ইচ্ছায় ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ-মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা কলেজ দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। এবং তিনি একই বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি ও ১৯৬৮ সালে একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি ১ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। হুমায়ুন আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াকালীন সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রা-বাসে ছিলেন।

কর্মজীবন: হুমায়ুন আজাদ, চট্টগ্রাম কলেজ।

প্রভাষক: কাজের মেয়াদ ১৯৬৯ থেকে ১৯৬৯ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রভাষক কাজের মেয়াদ: ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭০ থেকে ১৯৭০ জাহাঙ্গীর-নগর বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রভাষক কাজের মেয়াদ ১২ ডিসেম্বর ১৯৭০ থেকে ১৯৭৬ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রভাষক কাজের মেয়াদ: ১ নভেম্বর ১৯৭৮ সালের থেকে ১৯৮৬।
অধ্যাপক কাজের মেয়াদ: ১৯৮৬ থেকে ২০০৪।


আড়ো পড়ুন: হাসান হাফিজুর রহমান এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
আড়ো পড়ুন: হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সংক্ষিপ্ত জীবনী:


১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ২২ বছর বয়সে তার কর্মজীবন শুরু করেন চট্টগ্রাম কলেজে প্রভাষক হিসাবে। সেখানে কিছু কাল কর্মরত থাকার পর ১৯৭০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ব-বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসাবে নিয়োগ-প্রাপ্ত হন। একই বছর ১২ ডিসেম্বর তিনি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসাবে যোগদান। ১৯৭৩ সালে তার ১ম গবেষণা গ্রন্থ রবীন্দ্র প্রবন্ধ: রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা এবং একই বছর সেপ্টেম্বরে কাব্য-গ্রন্থ অলৌকিক ইস্টিমার প্রকাশিত হয়। সে বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি কমন ওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে ভাষা বিজ্ঞান পড়তে স্কটল্যান্ডে চলে যান। ১৯৭৬ সালে তিনি স্কট-ল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষা বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিলো বাংলা ভাষায় সর্ব-নামীয়করণ। এই গবেষণাপত্র ১৯৮৩ সালে প্রোনোমিনা-লাইজেশন ইন বেঙলি নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এডিনবরায় গবেষণাকালীন সময়ে তিনি রবার্ট ক্যাল্ডরের সহযোগিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ ও নিজের কিছু কবিতা অনুবাদ করে ছিলো যে গুলি ” লিডস বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল ” এবং এডিনবরার বিশ্ববিদ্যালয়ের ” চ্যাপম্যান ” সাময়িক-পত্রে প্রকাশিত হয়ে ছিলো।

১৯৭৮ সালের ১ নভেম্বর আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন এবং পরবর্তী কালে বাংলা বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।

সাহিত্যকর্ম:


মূল নিবন্ধ: হুমায়ুন আজাদের গ্রন্থ-তালিকা,
হুমায়ুন আজাদের কবিতার মাধ্যমে সাহিত্য-চর্চার শুরু করে ছিলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হবার পর তবে বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে থাকা কালীন তার ” ঘড়ি বলে টিক টিক ” শিরোনামে ১ম লেখা প্রবন্ধ ছাপা হয়ে ছিলো দৈনিক ইত্তেফাকের শিশু পাতা কচি-কাঁচার আসরে। শৈশবে পরবর্তীতে তিনি এই পত্রিকায় একাধিক প্রবন্ধ লিখে ছিলো। তার প্রকাশিত মৌলিক কাব্য-গ্রন্থের সংখ্যা (৭) এবং তার প্রকাশিত অ-প্রকাশিত কবিতা সমূহ জীবদ্দশায় হুমায়ুন আজাদের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯৩) ও কাব্য সংগ্রহ (১৯৯৮) এবং মৃত্যুর পরে কাব্যসমগ্র (২০০৫) বইয়ে প্রকাাশিত হয়ে ছিলো। সে ১২টি উপন্যাস লিখেছেন। তার উপন্যাস সমূহ উপন্যাস সমগ্র ১, (২০০১), উপন্যাস সমগ্র ২, (২০০২) এবং উপন্যাস-সমগ্র ৩, (২০০৩) বইয়ে প্রকাশিত হয়ে ছিলো। তিনি যাদুকরের মৃত্যু (১৯৯৬) নামে ১টি মৌলিক ছোট গল্পের বই লিখেছেন। এছাড়াও তার ৮টি কিশোর সাহিত্য, ও ৮টি ভাষা-বিজ্ঞান বিষয়ক বই রয়েছে।

কবিতা:


১ম কাব্য-গ্রন্থ অলৌকিক ইস্টিমার (১৯৭৩),
হুমায়ুন আজাদ কবিতার দ্বারা লেখা-লেখিতে হাত দিয়ে ছিলেন, তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলো তখনই তিনি মূলত কবিতা রচনায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হওয়ার পরেও ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি কবিতা লিখে থাকেন। ষাটের দশকের পরি-ব্যাপ্ত হতাশা, দ্রোহ, ঘৃণা, বিবমিষা, প্রেম ইত্যাদি তার কবিতার প্রধান মূল বিষয় ছিলো। তার ১ম কাব্য-গ্রন্থের নাম অলৌকিক ইস্টিমার যা ১ম প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ এর জানুয়ারিতে। কাব্য-গ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেন ১৯৬৮-১৯৭২ সালে তার নিজেরই কাটানো রাত-দিন গুলোর উদ্দেশ্যে। তার ২য় কাব্যগ্রন্থ জ্বলো চিতাবাঘ ১ম প্রকাশিত হয় মার্চ ১৯৮০ সালে। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে, ৩য় কাব্য গ্রন্থটি তিনি সমসাময়িক ২ বাংলাদেশী লেখক হুমায়ূন আহমেদ এবং ইমদাদুল হক মিলনকে উৎসর্গ করেছেন। প্রত্যুত্তরে ইমদাদুল হক মিলন তার বনমানুষ উপন্যাসটি হুমায়ুন আজাদকে উৎসর্গ করেন। ১৯৮৭ সালের মার্চে প্রকাশিত হয়ে ছিলো তার ৪র্থ কাব্য-গ্রন্থ যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল। তার ৫ম কাব্য-গ্রন্থ আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ সালে। এর ৮ বছর পর ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয় তার ৬ষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ কাফনে মোড়া অশ্রু-বিন্দু। কাব্য-গ্রন্থটি আজাদ তার ‘ প্রিয় মৃতদের জন্য ‘ উৎসর্গ করেন। ৭ম এবং শেষ কাব্য-গ্রন্থ পেরোনোর কিছু নেই প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি, ২০০৪ সালে। জীবদ্দশায় তার ৭টি কাব্য-গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তবে আজাদের মৃত্যুর পর ফেব্রুয়ারি, ২০০৫ সালে এই ৭টি কাব্য-গ্রন্থ সহ আরো কিছু অগ্রন্থিত ও অনূদিত কবিতা নিয়ে কাব্য সমগ্র প্রকাশিত হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে ঢাকার আগামী প্রকাশনী তার গ্রন্থাবলীর প্রধান প্রকাশক ছিলো।

গল্প:


হুমায়ুন আজাদ সর্ব-প্রথম একটি ছোট-গল্প লিখে ছিলো এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে স্কট-ল্যান্ড দিয়ে এসে, গল্পটির নাম তিনি দিয়ে ছিলো অনবরত তুষারপাত। এই গল্পটি তিনি পরে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাতে ১৯৭৯ সালে প্রকাশ করে ছিলো। এই গল্পটি সহ ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত লেখা আরও ৫টি গল্প তিনি যাদুকরের মৃত্যু (১৯৯৬) বইতে সংকলিত করে ছিলো। এরপর তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য আরো ৩টি গল্প লিখেন যে গুলো তিনি কিছু শিশু-তোষ কবিতা সহ বুক-পকেটে জোনাকি পোকা (১৯৯৩) গ্রন্থে সংকলন করেন। তিনি বইয়ের শুরুর দিকে বলে ছিলো,

কিশোর-কিশোরীদের জন্য আমি তিন দশকে লিখেছি কিছু প্রবন্ধ, কয়েকটি কবিতা, ৩টি গল্প। প্রবন্ধ গুলো একটু অন্য ধরনের; শব্দ, ভাষা, আর কবিতা সম্পর্কে; তাতে স্বপ্নের কথা আছে বেশি করে। কবিতা-গুলোতেও তাই; গল্প-গুলোতেও। এ গুলোকে এক বইতেই রাখলাম, কেননা এটা স্বপ্নের বই। এ গুলোকে গদ্যে লিখেছি বা ছন্দে লিখেছি, তবে এগুলো একই স্বপ্নে লেখা।

উপন্যাস:


হুমায়ুন আজাদের লেখা ১ম উপন্যাস ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল (১৯৯৪), যেটির প্রেক্ষাপট ছিলো ১৯৮০ এর দশক এবং উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র রাশেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যে বাংলাদেশের সমাজে চলা পরিবর্তন অবলোকন করে।
মূলত কবি, গবেষক ও প্রাবন্ধিক হলেও হুমায়ূন আজাদ ১৯৯০ এর দশকে ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্ম-প্রকাশ করেন। ২০০৪ সালে মৃত্যু অবধি তার প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ছিলো ১২টি।

১৯৯৪ সালে তিনি ঔপন্যাসিক হিসেবে নিজেকে আত্ম-প্রকাশ করেন ১ম উপন্যাস ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল এর মধ্যে থেকে। বাংলাদেশের সামরিক শাসন প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাসটি তিনি উৎসর্গ করেছেন উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রাশেদকে, তার বাবার নামও ছিলো রাশেদ, তিনি উপন্যাসের উৎসর্গ পাতায় এভাবে লিখে ছিলো,

উৎসর্গ পরলোকগত পিতা, আমি একটি নাম খুঁজে ছিলাম, আপনার নামটিই রাশেদ মনে পড়লো আমার।

১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় নারী পুরুষের মধ্যেকার শারীরিক ও হৃদয় সম্পর্কের নানা আবর্তন এবং পরিণতির আখ্যান মূলক উপন্যাস সব কিছু ভেঙে পড়ে। সব কিছু ভেঙে পড়ের পর তিনি মানুষ হিসেবে আমার অপরাধ সমূহ উপন্যাস লিখে ছিলো যেটি ছিলো একজন সরকারি কর্মকর্তার তার বন্ধুর স্ত্রীকে বিয়ে করা নিয়ে এবং তিনি এ উপন্যাসটি বাংলাদেশের খ্যাতিমান আইনজীবী ব্যারিস্টার আমির উল ইসলামকে উৎসর্গ করে লিখে ছিলো।

১৯৯৯ সালে প্রকাশিত উপন্যাস কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ এ হুমায়ুন আজাদ হাসান রশিদ নামের একজন কল্পিত বাঙালি কবির একজন বিবাহিত নারীর সাঙ্গে বিয়ে ছাড়া একত্র-বাসের বিষয়টি তুলে ধরে ছিলো।

২০০২ সালে প্রকাশিত ১০,০০০, ও আরো ১টি ধর্ষণ ছিলো বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের একটি ধর্ষিত মেয়ের জীবনকে নিয়ে যে তার ধর্ষণের ফসল বাচ্চাকে হত্যা করে।

২০০৪ সালে প্রকাশিত পাক সার জমিন সাদ বাদ ছিলো ধর্মীয় মৌলবাদ নিয়ে এবং একটি খুনের স্বপ্ন উপন্যাস ছিলো একজন তরুণের অপর একটি তরুণীর জন্য ভালোবাসার কাহিনী নিয়ে। পাক সার জমিন সাদ বাদে তিনি মৌলবাদে দীক্ষিত এক পুরুষকে সবার শেষে প্রেমের কাছে পরাজিত করান। দেখান যে কণকলতা নামের তরুণীর জন্য উপন্যাসের প্রধান নায়ক অপরাধ-জগৎ সঙ্গে বেরিয়ে আসে আর একটি খুনের স্বপ্নতে তিনি নায়িকা সুফিয়ার জন্য নায়কের অন্ধ প্রেমকেই করে তুলে ছিলো প্রধান উপজীব্য বিষয় যে নায়ক পরে নায়িকাকেই খুন করার চিন্তা করে। একটি খুনের স্বপ্ন উপন্যাসটি হুমায়ুন আজাদ তার নিজেরই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের (১৯৬৪ থেকে ১৯৬৮) স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করে লিখে ছিলো।

হুমায়ুন আজাদ ফালি ফালি ক’রে কাটা চাঁদ (২০০১) উপন্যাসে শিরিন নামের এক কল্পিত ব্যক্তিত্ব সম্পন্না নারীর অবতারণা করেছেন এই মনে করে যে মানসিক সম্পর্ক রাখা একটি গভীর আস্থার ব্যাপার। উপন্যাসটি ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী নারী-বাদের একটি চিত্র তুলে ধরে। শিরিনের স্বামী রয়েছে যার নাম দেলোয়ার কিন্তু সে একদা খালেদ নামের এক পুরুষের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হয় নিজের এক প্রকারের সম্মতিতেই। শিরিন পরে তার স্বামী দেলোয়ারের সাথে বাস করবেনা বলে সিদ্ধান্ত নেয় এবং খালেদ তাকে প্রেম প্রস্তাব দিলে সেটাও প্রত্যাখ্যান করে থাকে।

এছাড়াও নিজের সাথে নিজের জীবনের মধু উপন্যাসটি ছিলো একজন কিশোর বালকের কাহিনীর ভেতর দিয়ে প্রাপ্ত-বয়স্কদের জন্য রচিত উপন্যাস, যেখানে কিশোর-বালকটি গ্রামীণ পরিবেশে বড় হয়। নিজের সাথে নিজের জীবনের মধু উপন্যাসটিকে তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উপন্যাস মনে করতেন। তুলনা করতে গিয়ে এই উপন্যাসকে বিভূতিভূষণ বন্দো-পাধ্যায়ের পথের পাঁচালীর উপন্যাসের তুলনায় অনেক ভালো উপন্যাস বলে মনে করে ছিলো। পথের পাঁচালীর অপু চরিত্রের সাথে নিজের জীবনের মধুর জলকদর চরিত্রকে তুলনা করতে গিয়ে জলকদর চরিত্রকেই অনেক বেশি শিল্পোত্তীর্ণ চরিত্র মন্তব্য করে ছিলো তিনি। তিনি আরও বলে ছিলো যে, জলকদরের ভিতর দিয়ে তিনি নিজের কৈশোর জীবনকে দেখে ছিলো। নিজের সাথে নিজের জীবনের মধু উপন্যাসটির পূর্বে কিশোরদের জন্য হুমায়ুন আজাদ এর পূর্বে আব্বুকে মনে পড়ে নামে একটি উপন্যাসিকা লিখে ছিলো যেটা ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয়ে ছিলো এবং আমাদের শহরে একদল দেবদূত নামের আরও একটি কিশোর উপন্যাসিকা ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়ে ছিলো।

ভাষাবিজ্ঞান গবেষণা:


১৯৬০ এর দশকে আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন সময় পশ্চিমের ভাষা-বিজ্ঞানী চম্‌স্কি-উদ্ভাবিত রূপান্তর-মূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ তত্ত্বটি আলোড়ন সৃষ্টি করে ছিলো। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য আজাদ এই তত্ত্বের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষার রূপ-মূলতত্ত্ব তথা বাক্যতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন। এর মাধ্যমে বাংলার ভাষাবিষয়ক গবেষণায় আধুনিক ভাষা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূত্র: পাত ঘটে। তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভের নাম ছিলো প্রোনোমিনালাইজেশান ইন বেঙলি (অর্থাৎ বাংলা সর্বনামীয়করণ)। পরবর্তীতে ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে একই শিরোনামের এটি ইংরেজি ভাষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড দিয়ে প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলা ভাষার বাক্যতত্ত্বের ওপর বাক্যতত্ত্ব নামে একটি বই বাংলা একাডেমি দিয়ে প্রকাশ করা হয়। একই সালে বাংলা একাডেমি দিয়ে তিনি বাঙলা ভাষা শিরোনামে ২ খণ্ডের একটি দালীলিক সঙ্কলন প্রকাশ করেন, যাতে বাংলা ভাষার বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর বিগত শতাধিক বছরের বিভিন্ন ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকের লেখা গুরুত্ব-পূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক রচনা সংকলিত হয়। এই ৩টি গ্রন্থ বাংলা ভাষা বিজ্ঞানে গুরুত্ব-পূর্ণ সংযোজন হিসাবে বিবেচিত। তিনি পরবর্তী কালে তুলনা মূলক ও ঐতিহাসিক ভাষা-বিজ্ঞান (১৯৮৮) এবং অর্থবিজ্ঞান (১৯৯৯) শিরোনামে ২টি সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক পাঠ্য পুস্তক লেখেন। ১৯৯০ এর দশকের শেষের দিকে তিনি বাংলা ভাষার একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচনার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তবে মৃত্যুর কারণে তার এই আগ্রহ বাস্তবায়িত হয় নি।

প্রবন্ধ:


লাল-নীল দীপা-বলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী (১৯৭৬),
১৯৭৬ সালে ১ম প্রকাশিত ‘লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী’ বইটি ছিলো হুমায়ুন আজাদের ২য় প্রবন্ধ, এর পূর্বে তিনি ‘ রবীন্দ্রপ্রবন্ধ: রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা ‘ (১৯৭৩) নামের একটি প্রবন্ধ লিখে ছিলো।

১৯৯২ সালে প্রকাশিত নারী স্বাধীন বাংলাদেশে নারীবাদ বিষয়ক ১ম বই। এই প্রবন্ধ-গ্রন্থের জন্য তিনি তীব্র সমালোচিত হন। ফলে ১৯৯৫ সালের ১৯ নভেম্বর তৎকালীন সময় বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়ে ছিলো এবং প্রায় সাড়ে ৪বছর পরে ২০০০ সালের ৭ মার্চ উচ্চ-বিচারালয় বইটির নিষিদ্ধকরণ আদেশ বাতিল করে থাকেন।

ফরাসি নারী-বাদী দার্শনিক সিমোন দ্যা বোভোয়ারের ১৯৪৯ সালের গ্রন্থ ২য় লিঙ্গ হুমায়ুন আজাদ ২০০১ সালে বাংলায় অনুবাদ করেন। সিমোন দ্যা বোভোয়ারের লেখা তাকে নারী-বাদের প্রতি অনেক আকৃষ্ট করে ছিলা।

ফেব্রুয়ারি ২০০৩ সালে প্রকাশিত আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়ে ছিলাম, গ্রন্থে তিনি তার স্বপ্নের বাংলাদেশের করুণ অবস্থা দেখে ব্যথিত হয়ে বলে ছিলেন। বইটিতে তিনি বর্ণনা করে ছিলেন যে তিনি যেরকম প্রগতি-শীল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন তার স্বপ্ন পুর্বেই ভেঙে গেছে, তিনি বাংলাদেশের সমাজের অধঃপতন খুবই আক্ষেপের সাতে প্রকাশ করে ছিলো। তাছাড়া ও ২০০০ সালে প্রকাশিত মহা-বিশ্ব ছিলো একটি বিজ্ঞান-প্রবন্ধ বই।

ব্যক্তিগত জীবন:


হুমায়ুন আজাদ ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার সময় লতিফা কোহিনুর নামের এক তরুণীর সাথে পরিচিত হন এবং ১৯৭৫ সালের ১২ই অক্টোবর তাদের বিয়ে হয় টেলিফোনে; আজাদ তখন স্কট-ল্যান্ডে আর লতিফা বাংলাদেশে ছিলো। তাদের ২ কন্যা মৌলি আজাদ, স্মিতা আজাদ এবং এক পুত্র অনন্য আজাদ। জ্যেষ্ঠ কন্যা মৌলি আজাদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সহকারী সচিব হিসাবে দায়িত্বরত।

বিশ্বাস ও দর্শন:

আজাদ ব্যক্তিগত ভাবে ধর্মে বিশ্বাসী ছিলো না এবং তিনি সরাসরি ধর্মের সমালোচনা করে লেখেননি তবে ধর্মীয় মৌল-বাদের প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করতেন এবং এটি বিভিন্ন ভাবে তার লেখায় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বাংলাদেশের সমাজে চলা রক্ষণ শীলতা এবং প্রথার বিরোধিতা করতেন। সর্ব-প্রথম গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের আদলে ১৯৯১ প্রকাশিত প্রবচন-গুচ্ছ ব্যাপক আলোচিত সমালোচিত হয়ে ছিলো। হুমায়ুন আজাদের লেখা লেখিতে উদার-পন্থা, বিজ্ঞান-মনস্কতার এবং একই সাথে দ্রোহের ছাপ স্পষ্ট ছিলো। একটি বৈষম্যহীন আর্থ সামাজিক ব্যবস্থার স্বপ্নে তিনি দেখতেন। তিনি তার লেখনীতে প্রকাশ করে ছিলেন,

আমি এমন একটি সমাজ চাই যে সমাজ বলা যাক পশ্চিম ইউরোপীয় সমাজের চূড়ান্ত রূপ। সমাজ-তান্ত্রিক সমাজের স্বপ্নে বিভোর আমি নই, আমি চাই সবাই সচ্ছল থাকবে জ্ঞানচর্চা, আনন্দ, উল্লাস এবং যত-প্রথা রয়েছে সেসব অতিক্রম করে মানুষ সম্পূর্ণ মানবিক জীবন যাপন করবে।

রাজনৈতিক-সামাজিক সমালোচনা:


১৯৮০ র দশকের শেষ ভাগ থেকে হুমায়ুন আজাদ সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে গণ-মাধ্যমে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। এ সময় তিনি খবরের কাগজ নামীয় সাপ্তাহিক পত্রিকায় সম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখতে শুরু করেন। সামরিক শাসনের বিরোধিতা দিয়ে তার রাজনৈতিক লেখা লিখির সূত্র:পাত। মাতাল তরণী (১৯৯২) ছিলো তার রাজনৈতিক- সমাজ সমালোচনার সংকলন গ্রন্থ।

হত্যা প্রচেষ্টা:


২০০৩ সালে ইত্তেফাক পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় হুমায়ুন আজাদের পাক সার জমিন সাদ বাদ উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছিলো। ২০০৪ এর একুশে বই মেলাতে উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে দেশের মৌল-বাদী গোষ্ঠী তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়, এবং বিভিন্ন স্থানে হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা চালায়। তিনি এই উপন্যাসটিতে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা-কারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে পরোক্ষ-ভাবে ফ্যাসিবাদী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এর কঠোর সমালোচনা করেন, উপন্যাসটি তিনি ১৯৭১ সালেকে উৎসর্গ করে লিখে ছিলেন। তারই জের ধরে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বই-মেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় আসার পথে ঘাতকদের দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়ে ছিলেন তিনি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশে আজাদ প্রথমে বাংলাদেশের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, ঢাকাতে চিকিৎসা লাভ করেন যেখানে প্রধানমন্ত্রী তাকে দেখতে গিয়ে ছিলেন, পরে হুমায়ুন আজাদকে সরকারিভাবেই থাইল্যান্ডে পাঠানো হয় এবং তিনি সেখান থেকে অনেকটা সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। হুমায়ুন আজাদের উপর কারা হামলা করিরা ছিলো তা অনেক দিন ধরে অজানা ছিলো; জামাত-উল-মুজাহিদীন বাংলাদেশ সংক্ষেপে জেএমবি নামক ইসলামি জঙ্গী সংগঠনের একজন শীর্ষনেতা শায়খ আব্দুর রহমান পরবর্তীতে হুমায়ুন আজাদ এবং একই সাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম ইউনুসকে হত্যার নির্দেশ দেবার কথা স্বীকার করে ছিলো। এই হত্যা প্রচেষ্টার মামলা দ্রুত শেষ করার জন্য উচ্চ আদালত ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে আদেশ প্রদান করে।

সমালোচনা:


২০০৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন সাঈদী জাতীয় সংসদে হুমায়ুন আজাদের পাক সার জমিন সাদ বাদ (২০০৪) উপন্যাসটিকে ইসলাম বিরোধী আখ্যায়িত করে বিভিন্ন সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে থাকেন এবং এ ধরনের লেখকদের লেখা বন্ধ করতে ব্ল্যাসফেমি আইন (ধর্ম অবমাননা বিরোধী আইন) প্রণয়নের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই উপন্যাসটিতে হুমায়ুন আজাদ তীব্র রূপক-ঋণাত্মক ভাবে বাংলাদেশের একটি কাল্পনিক মৌলবাদী সংগঠনের চিত্র: তুলে ধরে ছিলো।

পুরস্কার এবং সম্মাননা:


পুরস্কারের তালিকা:

বাংলা একাডেমি পুরস্কার: ১৯৮৬ ,সামগ্রিক অবদান
অগ্রণী ব্যাংক-শিশু সাহিত্য পুরস্কার ১৯৮৬ শিশু সাহিত্য,
মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার ২০০৪ ,
একুশে পদক ২০১২ ভাষা ও সাহিত্য, মরণোত্তর

মৃত্যু:


২০০২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের উপর কাজ করার জন্য জার্মান সরকারের নিকট একটি বৃত্তির আবেদন করে ছিলো। ২০০৪ এর ৭আগস্ট জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের ওপর গবেষণা বৃত্তি নিয়ে জার্মানি চলেযান।

২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ আগস্ট রাতে একটি অনুষ্ঠান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আবাস-স্থলে আকস্মিক ভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন হুমায়ুন আজাদ। ১২ আগস্ট আবাস-স্থলের নিজ কক্ষে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর জার্মান সরকারের তত্ত্বাবধানে মিউনিখে তার নিজ বাসভবনে পাওয়া সব জিনিস-পত্র ঢাকায় তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। ওই জিনিস-পত্রের ভেতরেই পাওয়া যায় তার হাতের লেখা ৩টি চিঠি। চিঠি ৩টি আলাদা ৩টি পোস্ট কার্ডে লিখেছেন বড় মেয়ে মৌলিকে, ছোট মেয়ে স্মিতাকে এবং এক মাত্র ছেলে অনন্য আজাদকে। অনুমান করা হয়, ওই লেখার অক্ষর গুলোই ছিলো তার জীবনের শেষ লেখা। তার মরদেহ কফিনে করে জার্মানি থেকে ঢাকায় আনা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাযার নামাজ শেষে তার মরদেহ রাড়িখালে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয় এবং পরে তার কবর সিমেন্ট দিয়ে পাকা করে একটি বইয়ের মত করে বানানো হয়।

 

যুক্ত হোন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকুন ফেইজবুক পেইজে এখানে ক্লিক করে।

Check Also

সৈয়দ শামসুল হক এর জীবনী:

সৈয়দ শামসুল হক এর জীবনী: সৈয়দ শামসুল হক: জন্ম: সৈয়দ শামসুল হক ২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *